US Federal নতুন সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে নড়াচড়া — টানা তৃতীয়বার সুদ কমালো যুক্তরাষ্ট্র, সামনে আরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Federal রিজার্ভ (Fed) ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বছরের তৃতীয় দফায় সুদের হার কমিয়ে দিল। জেরোম পাওয়েলের নেতৃত্বাধীন Federal ওপেন মার্কেট কমিটি (FOMC) ২৫ বেসিস পয়েন্ট নেমে সুদের সীমা এনে দাঁড় করাল ৩.৫০%–৩.৭৫%— যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচের ধাপ।
যদিও সুদ কমানোর এই সিদ্ধান্ত বাজারের অনেক বিশ্লেষকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল, Federal এবার পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছে যে আগামী মাসগুলোতে সুদ কমানোর গতি থামতে পারে। অর্থাৎ টানা রেট কাটের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা বিরতি নিতে পারে, যাতে আগের কাটগুলোর প্রভাব বাস্তবে কেমন পড়ে তা মূল্যায়ন করা যায়

অর্থনীতির মিশ্র সংকেত— তবু রেট কাট
Federal র প্রেস কনফারেন্সে জেরোম পাওয়েল জানান যে মার্কিন অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক “অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করার অবস্থানে রয়েছে।”
অর্থনীতির বর্তমান চিত্র:
মুদ্রাস্ফীতি এখনো লক্ষ্য মাত্রার ওপরে
চাকরি বাজার দুর্বল হচ্ছে
সরকারি শাটডাউনের কারণে বহু অর্থনৈতিক তথ্যপ্রকাশে দেরি হয়েছে
ফেড জানায়, সামনের বছর আরো একবার রেট কাট হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে এখনই বড় ধরনের কাটের চিন্তা নেই
ফেড মিটিং–এর সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভোটের ভিন্নমত। রেট কাট ঘোষণার এই বৈঠকে ১২ সদস্যের কমিটির তিনজনই প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন— যা ফেডের অভ্যন্তরে নীতিগত বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। শিকাগো ফেডের প্রেসিডেন্ট অস্টিন গুলসবি ও কানসাস সিটির জেফ্রি শমিড মনে করেন, বর্তমান অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সুদ কমানো ঠিক নয়; বরং আগের হারই বজায় রাখা উচিত ছিল। অন্যদিকে গভর্নর স্টিফেন মিরান ঠিক উল্টো মত দিয়ে জানান, তার মতে আরও বড় পরিমাণে— কমপক্ষে অর্ধ শতাংশ— রেট কাট করা প্রয়োজন ছিল, যাতে দুর্বল চাকরি বাজারে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়। আর এই তিন দিকের টানাপড়েনই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ফেডের ভেতরে এখন হকিশ ও ডাভিশ দুই শিবিরের মতবিরোধ তুঙ্গে পৌঁছেছে। পাওয়েলও স্বীকার করেছেন, “চাকরি বাজার দুর্বল হচ্ছে, আবার মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য মাত্রার ওপরে— দুই দিকেরই যুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সত্যিই কঠিন ছিল।” ফলে বহুল আলোচিত এই বৈঠক শুধু রেট কাটের জন্য নয়, নীতি–নির্ধারকদের বড় মাত্রার মতপার্থক্যের কারণেও ২০২৬–এর অর্থনৈতিক গতিপথে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে
মার্কিন অর্থনীতির ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—চাকরি কমছে, অথচ জীবনযাত্রার খরচ বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ নভেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪ শতাংশে। সরকারি শাটডাউন চললেও বাজারে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার, যা এক ধরনের ইতিবাচক দিক হলেও সামগ্রিক অবস্থা তাতে খুব একটা বদলায়নি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ আমেরিকান নাগরিকের দৈনন্দিন ব্যয় লাগাতার বাড়ছে, ফলে ভোগব্যয় ও সঞ্চয়–—দুটিই চাপে আছে। অর্থনীতিবিদ মাইক ফ্রাতান্তোনির মতে, “দুর্বল চাকরি বাজার এবং বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখা এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ফেডের সুদ কমানোর পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের পথ এত সহজ নয়
পাওয়েলের মন্তব্য— ‘মজুরি দামকে ছাড়িয়ে বাড়তে হবে’
জেরোম পাওয়েল বলেন—
এখনো অনেক মানুষের কাছে দাম অত্যন্ত বেশি মনে হয়। সেজন্য কয়েক বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় বেশি হতে হবে, তবেই প্রকৃত স্বস্তি আসবে।
তবে বর্তমান সুদের হারকে তিনি বলেছেন নিউট্রাল রেটের উচ্চ প্রান্তে— অর্থাৎ এই হার অর্থনীতিকে না বাড়ায়, না কমায়। এটি ইঙ্গিত করে যে ফেড আর খুব বেশি কাটে যেতে চায় না
২০২৬ সালে বড় পরিবর্তনের পথে Federal
আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে ফেডের নেতৃত্বেই আসছে বড় ঝড়—
মে ২০২৬–এ পাওয়েলের মেয়াদ শেষ
নতুন চেয়ারের নাম ঘোষণা হবে
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপে নীতি আরও রাজনৈতিক হতে পারে
কেভিন হ্যাসেটকে সম্ভাব্য নতুন চেয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে
স্টিফেন মিরানের পদও জানুয়ারিতে খালি হবে
ট্রাম্প ফেডের উপর চাপ বাড়িয়ে বলেছেন—
“ফেড আরও বড় কাট দিতে পারত।”
এমনকী তিনি লিসা কুককে অপসারণের উদ্যোগও নিয়েছেন, যা আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ড্যাকো বলেন—
“যদি হ্যাসেটের মতো হকিশ সদস্যেরা দলে যোগ দেন, তাহলে ফেড আরও বিভক্ত হয়ে পড়বে। ২০২৬ হবে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সবচেয়ে অস্থির বছর।”
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়তে শুরু করলে Federal রিজার্ভকে রেট–নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৫–এ আসে প্রথম রেট–কাট, যা মূলত অর্থনীতির বাড়তি চাপ কমানোর লক্ষ্যেই ছিল। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চসুদের কারণে ব্যবসায়িক খাত এবং ভোক্তারা চাপে পড়েছিল, ফলে প্রবাহ কমছিল বিনিয়োগ ও ব্যয়—ফেড এই সংকট সামাল দিতেই প্রথমবার সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ঠিক পরেই অক্টোবর ২০২৫–এ ফেড আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমায়। সেই সময় Federal চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল ব্যাখ্যা করেছিলেন যে আমদানি–শুল্ক বৃদ্ধির ফলে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। শুল্ক বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়ায়, আর সেই খরচ বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকে। এই অস্বাভাবিক মূল্যচাপ সামলাতে ফেড আরেকটি কাট দেয়, যাতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরানো যায়।
তবে ডিসেম্বর মাসে রেট–কাট হবে কি না—ফেড তখনই সতর্ক করে বলেছিল যে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। পাওয়েল জানিয়েছিলেন, মুদ্রাস্ফীতির গতিপ্রকৃতি ও অর্থনৈতিক ডেটা আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবুও বাজারে জোর জল্পনা চলছিল যে বছরের শেষ দিকে আরও একটি কাট আসতে পারে। অবশেষে সেটিই সত্যি হয়—ডিসেম্বরে ফেড আরেকটি রেট–কাট ঘোষণা করে, যা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। এই ধারাবাহিক তিনটি কাট মূলত অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই নেওয়া পদক্ষেপ ছিল
